ল্যানসেটের গবেষণায় নতুন তথ্য
শুধু পানি পানেই কিডনির পাথর প্রতিরোধ হবে না
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বছরের পর বছর ধরে যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের একটি সহজ পরামর্শ দেওয়া হতো- ‘প্রচুর পানি পান করুন।’ প্রচলিত ধারণা ছিল, বেশি পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং পাথর সৃষ্টিকারী খনিজগুলো জমাট বাঁধতে পারে না।
তবে বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা এই পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি পানের পরও রোগীদের কিডনিতে পুনরায় পাথর হওয়ার ঝুঁকি আশানুরূপ কমেনি। এর অর্থ হচ্ছে, কিডনির পাথর প্রতিরোধে কেবল পানি পান করাই একমাত্র চূড়ান্ত সমাধান নয়।
কিডনিতে খনিজ এবং লবণ জমে শক্ত হয়ে এই পাথর তৈরি হয়, যা তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার কিডনিতে পাথর হলে পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে আবারও তা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ।
গবেষণায় কী দেখা গেছে?
১৬০০ জনেরও বেশি কিডনি পাথরের রোগীকে নিয়ে একটি বড় আকারের পরীক্ষা চালায় ল্যানসেট। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের বেশি করে পানি পানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, যারা বেশি পানি পান করেছেন এবং যারা সাধারণ নিয়ম মেনে চলেছেন, উভয়ের ক্ষেত্রেই পুনরায় পাথর হওয়ার হারে তেমন কোনো বড় পার্থক্য নেই।
এর প্রধান কারণ শুধু পানি পানের পরিমাণ বাড়ালেই যে শরীর সঠিকভাবে হাইড্রেটেড হচ্ছে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। চিকিৎসকদের মতে, পাথর প্রতিরোধ করতে হলে প্রতিদিন অন্তত ২.৫ লিটার প্রস্রাব নির্গত হওয়া প্রয়োজন, যা অনেক অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি।
ডায়েট বা খাবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি
পানি পানের চেয়েও খাদ্যাভ্যাস কিডনির পাথর প্রতিরোধে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কিছু কার্যকরী কৌশল নিচে দেওয়া হলো:
লবণ বা সোডিয়ামের পরিমাণ কমানো: খাবারে অতিরিক্ত লবণ প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম নির্গমন বাড়িয়ে দেয়, যা পাথর তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ।
পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ: প্রচলিত ভুল ধারণার বিপরীতে, খাবারে কম ক্যালসিয়াম থাকলে উল্টো কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রাণিজ প্রোটিন সীমিত করা: অতিরিক্ত মাংস বা প্রোটিন শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
অক্সালেটযুক্ত খাবার পরিহার: পালং শাক, বিটের মতো উচ্চ-অক্সালেটযুক্ত খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসকের ভূমিকা
যাদের বারবার কিডনিতে পাথর হয়, তাদের ক্ষেত্রে শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট নাও হতে পারে। পাথরের ধরন বুঝে চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট ওষুধ দিয়ে থাকেন। এই যেমন,
পটাশিয়াম সাইট্রেট: প্রস্রাবের ক্ষারীয় ভাব বজায় রেখে ক্রিস্টাল বা পাথর জমতে বাধা দেয়।
থিয়াজাইড ডাইউরেটিকস: প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমায়।
অ্যালোপিউরিনল: শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের উৎপাদন হ্রাস করে।
কতটুকু পানি পান করা উচিত?
বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট গ্লাস মেপে পানি পানের চেয়ে প্রস্রাবের রঙের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রস্রাবের রঙ হালকা হলুদ বা পানির মতো পরিষ্কার হওয়া সঠিক হাইড্রেশনের লক্ষণ।
সাধারণভাবে দৈনিক ২ থেকে ২.৫ লিটার প্রস্রাব তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত। তবে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায় বলে এখানকার মানুষের পানির প্রয়োজনীয়তা আবহাওয়া ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী আরও বেশি হতে পারে।
নতুন এই গবেষণার বার্তা পরিষ্কার, কিডনিতে পাথর রোধ করতে হলে কেবল পানির ওপর নির্ভর না করে একটি সমন্বিত উপায় বেছে নিতে হবে।
* পর্যাপ্ত পানি পান (লক্ষ্য থাকবে প্রস্রাবের পরিমাণের ওপর)।
* লবণ ও প্রোটিন নিয়ন্ত্রিত সুষম খাদ্য তালিকা।
* শরীরের আদর্শ ওজন বজায় রাখা।
* নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ।
তাই ‘যত বেশি পানি, তত কম পাথর’—এই সরল সমীকরণটি এখন পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। কিডনি সুস্থ রাখতে পানির ভূমিকা অবশ্যই আছে, তবে তার সঙ্গে সঠিক ডায়েট এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বজায় রাখাই আসল সমাধান।

