Logo
Logo
×

Advertisement

লাইফ স্টাইল

দলিলে জমির পরিমাণে গরমিল, সমাধান পাবেন যেভাবে

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০২ পিএম

দলিলে জমির পরিমাণে গরমিল, সমাধান পাবেন যেভাবে

ছবি: এআই সম্পাদিত

Advertisement

জমি কেনার পর দলিলের সঙ্গে খতিয়ানের জমির পরিমাণ না মিললে বিপাকে পড়েন অনেক মালিক। কখনো দলিলে জমির পরিমাণ বেশি লেখা থাকে, কখনো খতিয়ানে কম পাওয়া যায়। আবার কাগজপত্রে সব ঠিক থাকলেও সরেজমিনে মাপজোখে দেখা যায়, জমির পরিমাণ আরও কম। এমন পরিস্থিতিতে কোন নথির তথ্য সঠিক, কোথায় ভুল এবং কীভাবে তা সংশোধন করতে হবে, তা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির পরিমাণে সামান্য অমিলও অবহেলা করার সুযোগ নেই। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, নামজারি, নির্মাণকাজ, সীমানা নির্ধারণ কিংবা উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় বিরোধ দেখা দিতে পারে। এমনকি একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি বা অন্যের জমি নিজের বলে দাবি করার ঘটনাও ঘটতে পারে।

তবে দলিলে জমির পরিমাণ কম-বেশি থাকলেই মালিকানা হারানোর আশঙ্কা নেই। একইভাবে দলিলে বেশি জমি লেখা থাকলেই অতিরিক্ত অংশের মালিকানা নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দলিলের ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির তফসিল, চৌহদ্দি, দখল ও জরিপের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করতে হয়।

প্রথমেই শনাক্ত করতে হবে ভুল কোথায়

জমির পরিমাণে অমিল দেখা দিলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র পাশাপাশি রেখে যাচাই করতে হবে। সাধারণত চার ধরনের পরিস্থিতিতে এমন সমস্যা দেখা দেয়।

প্রথমত, দলিলে লেখার ভুল থাকতে পারে। যেমন, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পাঁচ শতাংশ জমি বিক্রির চুক্তি হলেও অসাবধানতাবশত দলিলে ছয় শতাংশ লেখা হয়েছে। আবার পাঁচ দশমিক ৫০ শতাংশের জায়গায় পাঁচ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ লেখা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল চুক্তি, বিক্রেতার মালিকানার দলিল, আগের খতিয়ান, জমির দখল ও সীমানা যাচাই করে ভুলটি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দলিল ঠিক থাকলেও খতিয়ানে জমির পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে। জরিপের সময় পরিমাপ, হিসাব কিংবা তথ্য লিপিবদ্ধ করার ভুলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুরোনো সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ানেও জমির পরিমাণ বা দাগ নম্বরে পার্থক্য থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোন জরিপের রেকর্ডে ভুল হয়েছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, দলিল ও খতিয়ানে জমির পরিমাণ ঠিক থাকলেও বাস্তবে কম জমি পাওয়া যেতে পারে। জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ, পাশের জমির মালিকের দখল কিংবা পরিমাপে ভুলের কারণে এমনটি ঘটে। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপানোর পাশাপাশি মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান ও দলিলের তফসিল মিলিয়ে দেখতে হবে।

চতুর্থত, বিক্রেতার নিজের মালিকানার চেয়ে বেশি জমি দলিলে উল্লেখ থাকতে পারে। এটি গুরুতর সমস্যা। কারণ বিক্রেতা নিজের মালিকানার বাইরে অতিরিক্ত জমি বিক্রি করলে দলিলে উল্লেখ থাকলেই ক্রেতা ওই অংশের বৈধ মালিক হয়ে যান না। তাই বিক্রেতার মালিকানার উৎস, পূর্ববর্তী দলিল, উত্তরাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট দাগে তাঁর প্রকৃত অংশ যাচাই করতে হবে।

দলিলের ভুল সংশোধন করবেন যেভাবে

দলিল তৈরির সময় প্রতারণা বা পক্ষগুলোর পারস্পরিক ভুলের কারণে প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটলে আদালতের মাধ্যমে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৩১ ধারায় এ বিষয়ে বিধান রয়েছে।

আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতারণা বা ভুলের বিষয়টি নিশ্চিত হলে দলিল সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে সরল বিশ্বাসে মূল্য দিয়ে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যে অধিকার অর্জন করেছেন, তাঁর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সংশোধন করা যায় না।

বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয় পক্ষ ভুল স্বীকার করলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সংশোধনী দলিল বা প্রয়োজনীয় নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাচাই করা যেতে পারে। তবে এক পক্ষ সম্মতি না দিলে কিংবা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

খতিয়ানে ভুল থাকলে কোথায় যাবেন

খতিয়ানের ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশোধনের প্রক্রিয়াও আলাদা। নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ কম-বেশি হওয়া, ভুল নামজারি কিংবা একাধিক নামজারি মামলার কারণে রেকর্ডে ভুল তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে বিবিধ বা মিস মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৫০ ধারার ক্ষমতাবলে রাজস্ব কর্মকর্তা উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নামজারি, জমাখারিজ ও জমা একত্রীকরণের আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।

এ জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করতে হয়। আবেদনে ভুলের বিবরণ, নিজের স্বত্ব কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। পরে শুনানি ও নথিপত্র যাচাই করে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।

অন্যদিকে, সর্বশেষ সংশোধিত জরিপের চূড়ান্ত প্রকাশিত রেকর্ডে ভুল থাকলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের আশ্রয় নিতে হতে পারে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫এ ধারায় এ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রয়েছে।

সাধারণভাবে চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশের তারিখ অথবা সংশ্লিষ্ট এলাকায় ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার তারিখ—যেটি পরে, সেখান থেকে এক বছরের মধ্যে মামলা করতে হয়। তবে নির্ধারিত শর্তে বিলম্বের কারণ সন্তোষজনক হলে পরবর্তী এক বছরের মধ্যেও মামলা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

নামজারি করলেই কি মালিকানা নিশ্চিত?

জমির মালিকানা নিয়ে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, নামজারি হয়ে গেলেই জমির মালিকানা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায়। বাস্তবে নামজারি মূলত সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ এবং ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

নামজারি খতিয়ানে মালিকের নাম, মৌজা, জেএল নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও প্রাপ্য অংশের হিসাব থাকে। কিন্তু নামজারি নিজে কোনো ত্রুটিপূর্ণ দলিলকে বৈধ করে না কিংবা অন্যের বৈধ মালিকানা বাতিল করে না।

অর্থাৎ, দলিলে ১০ শতাংশ জমি লেখা থাকলেও নামজারিতে আট শতাংশ উঠলে শুধু নামজারি করিয়ে বাকি দুই শতাংশের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আগে নিশ্চিত হতে হবে, ওই জমির ওপর ক্রেতার বৈধ স্বত্ব রয়েছে কি না এবং রেকর্ডে কোনো ভুল হয়েছে কি না।

যেসব কাগজপত্র সংগ্রহে রাখবেন

দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব জমির পরিমাণে অমিল দেখা দিলে শুরুতেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

১. জমির মূল দলিল ও সার্টিফায়েড কপি।

২. বিক্রেতার পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল বা বায়া দলিল।

৩. প্রযোজ্য সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ানের সার্টিফায়েড কপি।

৪. সংশ্লিষ্ট দাগের মৌজা ম্যাপ বা নকশা।

৫. নামজারি খতিয়ান ও নামজারি আদেশের কপি।

৬. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।

৭. জমির দখল ও সীমানা-সংক্রান্ত প্রমাণ।

৮. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ এবং বণ্টনসংক্রান্ত দলিল বা আদালতের আদেশ।

৯. জমি মাপজোখের প্রতিবেদন বা নকশা।

জমি কেনার আগেই যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

জমি কেনার পর দলিলের ভুল সংশোধনের চেয়ে কেনার আগে সব তথ্য যাচাই করা সহজ ও নিরাপদ। এ জন্য প্রথমেই দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে নিতে হবে। শুধু বিক্রেতার দেওয়া দলিলের ওপর নির্ভর না করে পূর্ববর্তী দলিল ও সংশ্লিষ্ট খতিয়ানও যাচাই করা জরুরি।

একই সঙ্গে দাগ নম্বর ও মৌজা ম্যাপ পরীক্ষা করতে হবে। দলিলে উল্লেখিত দাগের অবস্থান নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এরপর নিরপেক্ষ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে সরেজমিনে জমি মাপাতে হবে। দলিলে যতটুকু জমি লেখা আছে, বাস্তবে তার পুরোটা পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।

জমির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের সীমানা দলিলের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি হলে বিক্রেতার প্রাপ্য অংশ কত, অন্য ওয়ারিশদের অংশ কত এবং আগে কোনো অংশ বিক্রি হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

খাস জমি লিজ নেওয়ার ফি, সময় ও আবেদন প্রক্রিয়া জেনে নিন

খাস জমি লিজ নেওয়ার ফি, সময় ও আবেদন প্রক্রিয়া জেনে নিন

বাবা-দাদার নামে কোথায় কত জমি, সহজেই জানুন মোবাইলে

বাবা-দাদার নামে কোথায় কত জমি, সহজেই জানুন মোবাইলে

ভাই-বোন না থাকলে মৃত নারীর জমি বণ্টন হবে যেভাবে

ভাই-বোন না থাকলে মৃত নারীর জমি বণ্টন হবে যেভাবে

এক ক্লিকেই জমির পর্চা: ঘরে বসে যেভাবে খুঁজবেন ও পাবেন

এক ক্লিকেই জমির পর্চা: ঘরে বসে যেভাবে খুঁজবেন ও পাবেন

পৈতৃক জমি কতটুকু রয়েছে, বের করবেন যেভাবে

পৈতৃক জমি কতটুকু রয়েছে, বের করবেন যেভাবে

খতিয়ানে নাম আছে, দলিল নেই? যেভাবে প্রমাণ করবেন জমির মালিকানা

খতিয়ানে নাম আছে, দলিল নেই? যেভাবে প্রমাণ করবেন জমির মালিকানা

আরও পড়ুন

দলিলে জমির পরিমাণে গরমিল, সমাধান পাবেন যেভাবে

দলিলে জমির পরিমাণে গরমিল, সমাধান পাবেন যেভাবে

কম টেস্টোস্টেরনের কারণে পুরুষের শরীরে দেখা দিতে পারে এই ৫ সমস্যা

কম টেস্টোস্টেরনের কারণে পুরুষের শরীরে দেখা দিতে পারে এই ৫ সমস্যা

ঘুমের আগে এলাচ খাওয়ার উপকারিতা

ঘুমের আগে এলাচ খাওয়ার উপকারিতা

নেইল পলিশ ব্যবহারে বন্ধ্যত্ব থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি?

নেইল পলিশ ব্যবহারে বন্ধ্যত্ব থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম