Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

মসজিদ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাণভোমরা

Advertisement

তোফায়েল গাজালি

তোফায়েল গাজালি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মসজিদ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাণভোমরা

Advertisement

পবিত্র জুমার দিন কিংবা পাঁচওয়াক্ত নামাজের সময় যখন পাড়ার মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজান ভেসে আসে, তখন চারপাশের ব্যস্ত কোলাহল নিমেষেই শান্ত হয়ে যায়। মসজিদে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যখন ধনী-দরিদ্র, মনিব-ভৃত্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, তখন এক পরম সাম্যের ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এই চেনা দৃশ্যটির আড়ালে এক বিশাল ঐতিহাসিক ও সামাজিক সত্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা আজ প্রায় ভুলতে বসেছি। মসজিদ শুধুই চার দেওয়ালের মাঝে আবদ্ধ কোনো উপাসনালয় নয়; বরং এটি ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র, যার পুনরুজ্জীবন বর্তমানের অবক্ষয়িত সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

মদিনার মসজিদের সোনালি অতীত : ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর প্রথম যে কাজটি করেছিলেন, তা হলো ‘মসজিদে নববী’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। এটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না, বরং এটিই ছিল ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও বিচারিক সদর দপ্তর। মদিনার সেই সমাজব্যবস্থায় মসজিদ ছিল একাধারে, সংসদ ভবন ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ-বিগ্রহের কৌশল এবং কূটনৈতিক আলোচনাস্থল, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার আঁতুড়ঘর। মসজিদের এক কোণে গড়ে উঠেছিল ‘আসহাবে সুফফা’, যা ছিল ইসলামের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। যে কোনো সামাজিক বিরোধের মীমাংসা, অভাবী মানুষের পুনর্বাসন এবং বায়তুল মালের (রাষ্ট্রীয় তহবিল) বণ্টন হতো মসজিদ থেকেই।

পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া, আব্বাসীয় কিংবা অটোমান-যে কোনো মুসলিম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের দিকে তাকালে দেখা যাবে, প্রতিটি নগরের প্রাণকেন্দ্রে থাকত একটি মহিমান্বিত মসজিদ। আর সেই মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, বাজার, চিকিৎসালয় এবং বিচারালয়। বাগদাদ, কর্ডোভা বা দামেস্কের ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থা ছিল মূলত মসজিদকেন্দ্রিক।

বাংলার সমাজ ও মসজিদ : আমাদের এই পলল দ্বীপে-বাংলাদেশেও কিন্তু ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে মসজিদকে কেন্দ্র করেই সমাজ গড়ে উঠেছিল। গ্রামীণ সমাজে ‘পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থা পরিচালিত হতো মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় মুরুব্বিদের সমন্বয়ে। পাড়ার যে কোনো বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা উৎসব-আয়োজন, সবকিছুর সিদ্ধান্ত হতো নামাজের পর মসজিদের বারান্দায় বসে। মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি সুশৃঙ্খল ‘পাড়া’ বা ‘মহল্লা’র ধারণা গড়ে উঠেছিল, যেখানে একে অপরের খোঁজ রাখা এবং বিপদে এগিয়ে আসা ছিল বাধ্যতামূলক সামাজিক দায়িত্ব।

বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা : আজ আমাদের দেশে পাড়ায় পাড়ায় সুদৃশ্য, বহুতল এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদের অভাব নেই। মার্বেল পাথর আর আধুনিক লাইটিংয়ে মসজিদগুলো চকচক করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অনুপাতে কি আমাদের সামাজিক বন্ধন উন্নত হয়েছে?

আজকের বাস্তবতায় মসজিদগুলো যেন শুধু ‘পার্ট-টাইম’ বা খণ্ডকালীন ইবাদতখানায় পরিণত হয়েছে। আজানের পর মানুষ আসে, নামাজ পড়ে এবং মোনাজাত শেষ করেই দ্রুত জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে যে যার পথে চলে যায়। নামাজের বাইরে মসজিদের ফটকগুলো সাধারণত তালাই ঝুলানো থাকে।

ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। সমাজ থেকে মসজিদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, মাদকাসক্তি, পারিবারিক কলহ, প্রবীণদের একাকিত্ব এবং তরুণ প্রজন্মের ভেতরে চরম নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। যে তরুণ সমাজকে আলোর পথ দেখানোর কথা ছিল, তারা আজ ভার্চুয়াল জগতের গোলকধাঁধায় কিংবা মাদকের মরণনেশায় বুঁদ হয়ে আছে। কারণ, তাদের হাত ধরে রাখার মতো কোনো প্রাণবন্ত সামাজিক কেন্দ্র আজ আর সচল নেই।

সময়ের দাবি : বর্তমান যুগের জটিল সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং অবক্ষয় রুখতে হলে মসজিদকে তার পুরোনো রূপে ফিরিয়ে আনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এটি কোনো পেছনের দিকে হাঁটা নয়, বরং শিকড়ের শক্তিতে ভর করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। কেন এটি আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করলেই স্পষ্ট হয়-

নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়তে : আজকের কিশোর ও যুবসমাজকে শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে সোজা পথে রাখা সম্ভব নয়। তাদের প্রয়োজন আত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধি। মসজিদ যদি শুধু নামাজের স্থান না হয়ে একটি ‘কালচারাল হাব’ বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে, যেখানে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে তরুণদের নিয়ে সমসাময়িক বিষয়ে কাউন্সেলিং করা হবে, তবে তারা অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসবে।

মাদক ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির অবসান : পাড়ার মসজিদ কমিটি যদি মহল্লার প্রতিটি তরুণের খোঁজ রাখে, তাদের সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করে, তবে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার সুযোগই থাকবে না। মসজিদে যদি একটি ছোট পাঠাগার থাকে, ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা থাকে (যা শরিয়তসম্মত), তবে তরুণরা অবসর সময়ে সেখানে গিয়ে সুস্থ আড্ডায় মাতবে, মাদকের আড্ডায় নয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক নেটওয়ার্ক : একটি মসজিদকেন্দ্রিক সমাজে কেউ না খেয়ে ঘুমাতে পারে না। মহল্লার কার ঘরে চাল নেই, কার সন্তান টাকার অভাবে পরীক্ষা দিতে পারছে না, কার চিকিৎসা আটকে আছে, এই তথ্যগুলো মসজিদের ইমাম বা কমিটির কাছে থাকা উচিত। জুমার খুতবায় পরকালের আলোচনার পাশাপাশি মহল্লার অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বাস্তবমুখী তাগিদ দেওয়া হলে সামাজিক বৈষম্য অনেকটাই কমে আসবে।

ঘরোয়া সমাধান : আজ সামান্য কারণে মানুষ আদালতে দৌড়াচ্ছে, বছরের পর বছর মামলা লড়ছে এবং সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অথচ মসজিদের ইমাম এবং সমাজের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি যদি সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাড়ার ছোটখাটো বিরোধ বা পারিবারিক কলহ মিটিয়ে ফেলে, তবে তা সমাজের শান্তি ফিরিয়ে আনবে এবং আদালতের ওপর চাপ কমাবে।

রূপরেখা : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দেশে বেশ কিছু মডেল মসজিদ নির্মিত হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের প্রতিটি সাধারণ মসজিদকেই একেকটি সামাজিক জিয়নকাঠি হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন :

মসজিদভিত্তিক পাঠাগার : প্রতিটি মসজিদে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকবে, যেখানে ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি ইতিহাস, বিজ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার বই থাকবে।

বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্র ও রক্তদান ব্যাংক : মসজিদের একটা অংশে সপ্তাহে অন্তত একদিন পাড়ার ডাক্তাররা বিনামূল্যে গরিবদের চিকিৎসা দেবেন। একটি ব্লাড ডোনার গ্রুপ থাকবে মসজিদের তত্ত্বাবধানে।

কর্মসংস্থান ও জাকাত ফান্ড : প্রতিবছর মসজিদের জাকাত ফান্ড দিয়ে মহল্লার অন্তত ৩-৪ জন বেকার যুবককে রিকশা, সেলাই মেশিন বা ছোট দোকান করে দিয়ে স্বাবলম্বী করা যেতে পারে।

নারীদের অংশগ্রহণ : মদিনার মসজিদে নববীতে নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। আজ আমাদের সমাজেও নারীদের নৈতিক শিক্ষার জন্য মসজিদে নিরাপদ ও পর্দার সঙ্গে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা উচিত।

দায়বদ্ধতা : মসজিদকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধান কারিগর হলেন মসজিদের ইমাম সাহেবরা। তাদের শুধু ‘নামাজ পড়ানোর চাকরিজীবী’ হিসাবে দেখলে চলবে না; তাদের হতে হবে সমাজের পথপ্রদর্শক। ইমামদের সমসাময়িক জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বে দক্ষ হতে হবে, যেন তারা তরুণ প্রজন্মের যুক্তির জবাব পরম মমতায় দিতে পারেন। একইসঙ্গে মসজিদ কমিটিতে শুধু সম্পদশালীদের না রেখে সৎ, শিক্ষিত ও উদ্যমী যুবকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মসজিদের মিনার থেকে যে ঐক্যের ডাক আসে, সেই ডাককে শুধু নামাজের কাতারেই নয়, জীবনের প্রতিটি কাতারে ছড়িয়ে দিতে হবে। আসুন, আমাদের মসজিদগুলোকে শুধু পাথরের সৌন্দর্যে নয়, মানবিকতা, শিক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণের আলোয় উজ্জ্বল করে তুলি। তবেই গড়ে উঠবে একটি শান্তিময়, অপরাধমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ।

লেখক : সহসম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম