নিউইয়র্কের চিঠি
আমেরিকার জনসংখ্যা বিস্ফোরণ পরিকল্পনা
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার নিম্নগামী হওয়ায় দেশটির নীতিনির্ধারকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। জন্মহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে তা উন্নীত হচ্ছে না। ফলে ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অভিবাসীসহ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বার্ষিক এক শতাংশেরও কম (০.৯৮ শতাংশ)। অভিবাসী সংখ্যা বাদ দিলে প্রকৃত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরও অনেক কম। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার ছিল সবসময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, প্রতিজন নারীর প্রজনন হার ছিল মাত্র ১.৬; অর্থাৎ ৩৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সি নারীরা জন্ম দিয়েছেন ৩৬ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৪ জন শিশু। সাধারণভাবে বলা যায়, সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত সময়ে প্রতি ১ হাজার নারী জন্ম দিয়েছেন ৫৩.৮টি সন্তান। জন্মহার বৃদ্ধি করা সম্ভব না হলে অথবা অভিবাসন ছাড়া জনসংখ্যা স্থিতিশীল পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব না হলে সব ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কীভাবে এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, তা ভেবে কোনো কূলকিনারায় পৌঁছতে পারছেন না নীতিনির্ধারকরা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর ঘোষণা করেছেন, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি আমেরিকান শিশুর জন্য ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’ নামে তার বাবা-মার খোলা বিনিয়োগ অ্যাকাউন্টে ইউএস ট্রেজারি থেকে এককালীন ১ হাজার ডলার জমা দেওয়া হবে, যা গড়ে ৭ শতাংশ মুনাফা পাবে এবং শিশুটি ১৮ বছর বয়সে উন্নীত হলে সে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু এ প্রণোদনা জন্মহার বৃদ্ধিতে খুব ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন না খোদ প্রশাসনের কর্তারাই। কারণ ১৮ বছরে মুনাফাসহ অ্যাকাউন্টে জমা হবে মোট ৩৭৫০ ডলার। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বাবা-মা তাদের নিজস্ব উদ্যোগে এ অ্যাকউন্টে বার্ষিক কর-পরিশোধিত ২৫০০ ডলার পর্যন্ত জমা দিতে পারবেন। বাবা-মা ছাড়াও এ অর্থের আরও উৎস হতে পারে বাবা-মার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা। তবে সব মিলিয়ে বার্ষিক জমার পরিমাণ ৫ হাজার ডলারের বেশি হতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, ‘শিশুদের হাতে আমেরিকার ভবিষ্যতের মালিকানা তুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমরা এ মহান উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ২০২৮ সালকে এ উদ্যোগের শেষ সময় নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ তখন শেষ হবে।
হোয়াইট হাউজে দ্বিতীয় দফা প্রবেশ করার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার দ্রুত হ্রাসমান জন্মহারের চিত্র পালটে দেওয়ার ব্যাপারে সোচ্চার হন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স নিজেও জন্মহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার কথা বলেন। জানুয়ারিতে তিনি গর্ভপাতবিরোধী এক সমাবেশে উল্লেখ করেন, ‘আমরা যে শুধু মানুষের দাবির মুখে গর্ভপাতের সংস্কৃতির পক্ষে অনুমতি দিয়ে একটি ব্যর্থ প্রজন্মে পরিণত হয়েছি তা নয়, আমরা তরুণ দম্পতিদের সুখী ও অর্থবহ জীবন পরিচালনার জন্য তাদের যা প্রয়োজন, সেসব উপাদান জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা প্রদর্শন করে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। আমাদের সমাজ তার বাধ্যবাধকতাকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে যে, সমাজে একটি প্রজন্মের বসবাসের অন্যতম মৌলিক একটি দিক হলো প্রজন্মের পরম্পরা ধরে রাখা। সেজন্য আমরা আমেরিকায় আরও শিশু চাই।’
গত বছরের এপ্রিলে নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন সন্তান জন্মদানকারী নারীদের মাথাপিছু ৫ হাজার ডলার ‘বেবি বোনাস’ প্রদানের বিষয় বিবেচনা করছে এবং কংগ্রেসম্যানরা বেসরকারি হেলথ ইন্স্যুরেন্সধারী নারীদের হাসপাতালে বিনা খরচে সন্তান প্রসব এবং পরিবহণ ব্যয় সরকারের পক্ষ থেকে বহনের প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার বিষয় বিবেচনা করে প্রস্তাবটি মাঝপথে থেমে আছে। কারণ আমেরিকান জনগণের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ হতে এবং সন্তান নিতে অনাগ্রহী। সেজন্য অনেকে বিশ্বাস করেন, সন্তান ধারণে সক্ষম নারীদের ‘বেবি বোনাস’ প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে দমে যাননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ দেখতে চান। তরুণ দম্পতিদের সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ট্রাম্প নিজেকে ‘ফার্টিলাইজেশন প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘কিং অফ আইভিএফ’ বা ‘ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন’ হিসাবে ঘোষণা করে কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ও এসব প্রযুক্তির প্রাপ্যতা সহজলভ্য করার প্রতিশ্রুতি দান করেন। তিনি প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে ‘আইভিএফে’র ব্যয় হ্রাস এবং এর প্রাপ্যতা সহজ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ উদ্যোগ গ্রহণের মুখ্য কারণ হলো, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট অব আলাবাম ভ্রুণকে জীবিত শিশু হিসাবে গণ্য করা এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে ঘোষণা করার পর রাজ্যটির ‘আইভিএফ’ ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি হস্তক্ষেপ করেন, যাতে ‘আইভিএফ’ ক্লিনিকগুলো চালু থাকে এবং আমেরিকান জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঘটানোর লক্ষ্যে তার গৃহীত কর্মসূচিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। আলাবামার আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, ‘আইভিএফ’ পদ্ধতিতে সৃষ্ট ভ্রুণ ‘শিশু’ অথবা ‘জন্মগ্রহণ না করা শিশু’ হিসাবে বিবেচিত, যা ধ্বংস করা রাজ্যের ‘শিশুর ভুলজনিত মৃত্যুসংক্রান্ত আইন’ (রঙফুল ডেথ অব এ মাইনর অ্যাক্ট) অনুযায়ী, সিভিল বা দেওয়ানি অপরাধ ও শাস্তিযোগ্য। এ রায়ের ফলে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের বহু ‘আইভিএফ’ ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায় এবং চিকিৎসক ও রোগীদের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় যে, ‘আইভিএফ’ ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তিসহ সাধারণভাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ মামলায় বাদী ছিলেন তিনটি দম্পতি, যারা একটি ফার্টিলিটি সেন্টারে ‘আইভিএফ’ চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তিন নারীই সফলভাবে গর্ভধারণ করেন এবং স্বাস্থ্যবান সন্তানের জন্ম দেন। একই পদ্ধতি গ্রহণ করে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের অন্যান্য ক্লিনিকে চিকিৎসা গ্রহণকারীরা গর্ভধারণ করে ও সন্তানের জন্ম দেয়। এ ফলাফলে উৎসাহিত হয়ে ক্লিনিকগুলো অতিরিক্তসংখ্যক ভ্রুণ উৎপাদন করে সেগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে, যাতে কোনো আগ্রহী দম্পতির প্রয়োজন হলে তা সংশ্লিষ্ট নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা যায়। কিন্তু কয়েক বছর আগে একটি ক্লিনিকের ভ্রুণ সংরক্ষণ ইউনিটে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় কিছু ভ্রুণ হাত থেকে নিচে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তিন বাদী দম্পতি এ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হলে বিচারিক আদালত এ মর্মে মামলাটি খারিজ করে দেন যে, ‘ভিট্রো’তে সংরক্ষিত ভ্রুণ কোনো মানুষ বা শিশু ছিল না, যা শিশুর ‘ভুলজনিত মৃত্যুসংক্রান্ত আইনে’ বিচারযোগ্য হতে পারে।
বাদীরা বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে রাজ্যের সুপ্রিমকোর্টে আপিল করেন। সুপ্রিমকোর্ট বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত খণ্ডন করে উল্লেখ করেন, রাজ্যের এ সংক্রান্ত আইনের দৃষ্টিতে ‘ভ্রণ’গুলো জন্মগ্রহণ না করা সত্ত্বেও ‘শিশু’ হিসাবে গণ্য এবং সেগুলো সম্ভাব্য আগ্রহী নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন না করে দুর্ঘটনার কবলে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। আদালত ‘ইভিএফ’ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়ে ভ্রুণ সংরক্ষণে সার্বিক সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। ‘ইভিএফ’ পদ্ধতি চালু রাখার পাশাপাশি এসব ক্লিনিকের সম্প্রসারণ ও সন্তান গ্রহণে দম্পতিদের উৎসাহিত করা ছাড়াও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার ঐতিহ্যগত পারিবারিক মূল্যবোধ্যে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের সঙ্গে আমেরিকান জন্মহার আশঙ্কাজনক হ্রাস পাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি আমেরিকান নারীদের প্রতি আহ্বান জানান অধিক সন্তান গ্রহণ করতে। উল্লেখ্য, রিপাবলিকানরা প্রচলিতভাবে গর্ভপাতবিরোধী ও গর্ভপাত ক্লিনিক বন্ধ করার দাবিতে সোচ্চার।
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও প্রজনন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে জন্মহার বৃদ্ধি করা যায় না। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর মাতৃত্বকালীন ও শিশুসেবামূলক সহায়তা কর্মসূচি সংকুচিত করছে, অন্যদিকে জন্মহার বৃদ্ধির কথা বলছে। শিশু পরিচর্যার সামর্থ্য সৃষ্টি করা না হলে কোনো দম্পত্তি, বিশেষ করে দরিদ্র, স্বল্প, এমনকি মাঝারি আয়ের আমেরিকানরাও তাদের পরিবারে শিশুকে স্বাগত জানাতে উৎসাহী হবে না। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ইকোনমিকস অ্যান্ড জেন্ডার বিষয়ের অধ্যাপক ম্যারিনা আদশাদে বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন যদি সত্যিই জন্মহার বৃদ্ধি করতে চায়, তাহলে তাদের প্রথমে যে কাজটি করতে হবে, তা হলো বেতনসহ নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি অনুমোদন এবং সাশ্রয়ী ডে-কেয়ার সুবিধা বৃদ্ধি। যেহেতু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা করেন, সব আমেরিকান শিশু নিরাপদে বেড়ে উঠুক এবং দেশকে গড়ে তুলতে তাদের স্বপ্ন পূরণ করুক, সেজন্য তার প্রশাসনকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক
