চিরস্মরণীয় এক স্বপ্নস্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম
কর্মে, সৃষ্টিতে ও মানবিক প্রেরণায় অম্লান এক নাম
Advertisement
অলিদুর রহমান অলি
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলাম।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন শুধু নিজের জীবন গড়তে নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে। তাদের কর্ম, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, গণমাধ্যম, কর্মসংস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম তেমনই এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।
১৩ জুলাই ২০২৬ তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি এই মহৎ মানুষটিকে। মহান আল্লাহতাআলা তার সব নেক আমল কবুল করুন, কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন...আমিন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেমের যে অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন, স্বাধীনতার পর তা রূপ নেয় শিল্পবিপ্লব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মহাপরিকল্পনায়। তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান যমুনা গ্রুপ। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আজও দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবিকার অবলম্বন হয়ে আছে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের বিকল্প নেই। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক যুগান্তর, যা দীর্ঘদিন ধরে সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও জনমুখী সাংবাদিকতার এক নির্ভরযোগ্য নাম। একইভাবে যমুনা টেলিভিশনও সংবাদ পরিবেশনে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। তার কাছে গণমাধ্যম ছিল কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার।
দেশের আধুনিক নগরায়ণ ও বাণিজ্যের অনন্য স্থাপনা যমুনা ফিউচার পার্ক তার সুদূরপ্রসারি চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন। এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয় বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন, উদ্যোক্তা-সাহস এবং আধুনিকতার এক গৌরবোজ্জ্বল প্রতীক।
২০২০ সালের ১৩ জুলাই ৭৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন; কিন্তু মানুষের জীবন শেষ হলেও মহৎ কর্ম কখনও শেষ হয় না। তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং অসংখ্য কল্যাণমুখী উদ্যোগ আজও তার জীবন্ত উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করছে।
তার গড়ে তোলা দৈনিক যুগান্তরের পাঠক সংগঠন ‘যুগান্তর স্বজন সমাবেশ’ আজ দেশব্যাপী মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সাংস্কৃতিক চর্চা, পাঠাভ্যাস এবং স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ মানবসেবা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে কর্মরত অসংখ্য সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মীর পথচলার পেছনে যুগান্তর স্বজন সমাবেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান রয়েছে। এই সংগঠন কেবল পাঠকের মিলনমেলা নয় এটি মানবিক মানুষ গড়ার এক অনন্য বিদ্যাপীঠ, যেখানে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সাংবাদিকতার মূল্যবোধ একসূত্রে গাঁথা।
নুরুল ইসলামের স্বপ্ন ছিল মানুষের জন্য কাজ করা, মানুষের পাশে থাকা এবং সমাজকে আলোকিত করা। সেই স্বপ্নেরই এক জীবন্ত ধারক ও বাহক হয়ে আজও এগিয়ে চলেছে যুগান্তর স্বজন সমাবেশ। তার রোপণ করা এই মানবিক বীজ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে, যার ছায়ায় দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষ সেবা, ভালোবাসা ও প্রেরণার আলো খুঁজে পাচ্ছে।
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার রেখে যাওয়া কর্মে। নুরুল ইসলাম সেই বিরল মহাপুরুষদের একজন, যার জীবন আমাদের শেখায়- দেশপ্রেম শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয় শিল্প সৃষ্টি, কর্মসংস্থান, মানবিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের কল্যাণে নিরলস কাজের মধ্য দিয়েও মাতৃভূমিকে ভালোবাসা যায়।
তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই প্রজ্ঞাবান শিল্পনায়ক, সফল উদ্যোক্তা, গণমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষক, মানবিক সমাজ বিনির্মাতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, এমন মানুষ পৃথিবীতে অনেক দিন পরপর আসে। নুরুল ইসলামের আদর্শ, তার সৃষ্টি এবং তার মানবিক দর্শন চিরকাল বেঁচে থাকবে। যুগান্তর স্বজন সমাবেশও তারই প্রেরণায় মানুষের কল্যাণে, সত্যের পক্ষে এবং মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে এগিয়ে চলুক- এটাই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা।
আল্লাহতাআলা মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের রুহের মাগফিরাত দান করুন, তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন এবং তার রেখে যাওয়া সব কল্যাণকর কর্মকে কিয়ামত পর্যন্ত সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন...আমিন।
লেখক: সভাপতি, যুগান্তর স্বজন সমাবেশ, টঙ্গী শাখা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, যুগান্তর স্বজন সমাবেশ, কেন্দ্রীয় কমিটি।
