Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

রংপুরে ৪ খুন

দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা, গ্রেফতার দুজনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর

Icon

মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম

দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা, গ্রেফতার দুজনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর

Advertisement

রংপুর নগরীর দাসপাড়ায় (মাছুয়াপাড়ায়) অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। হত্যার পেছনে হত্যাকারীদের ছিল দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা। মাদকাসক্তের কারণে হত্যা করেছে বলে গ্রেফতার দুইজনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। এমনটাই ভাবছে মামলার তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থা।

তাছাড়া ঘটনার প্রায় দেড় মাস আগে হত্যার দায়ে গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা ও তার কাকা কেন বাড়ি ও জমি বিক্রি করেছেন মামলার তদন্ত সংস্থাকে এ নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। জমি বিক্রি করে হত্যার পর পালিয়ে যাওয়া পরিকল্পনা ছিল কি তাদের।

এ সম্পর্কে বুধবার যুগান্তরে খবর প্রকাশিত হলে গোয়েন্দা পুলিশের মামলার কর্মকর্তা বিষয়টি আমলে নিয়ে এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য দিয়েছে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বন্দি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। এতে তারা আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ও পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যেসব কথা বলেছে তার সঙ্গে অনেক কথাই মিলছে না। আর হত্যার সময়কাল অভিযুক্ত দুইজন যা বলেছে তা পুলিশের হাতে যেসব তথ্যপ্রমাণ রয়েছে এবং যুগান্তরের অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে তাতে ওই সময়ে হত্যার ঘটনা ঘটেনি তা নিশ্চিত। তবে হত্যার সময়কাল নিয়ে কেন অভিযুক্তরা মামলার তদন্ত কার্যক্রমকে বিভ্রান্ত করছে তা নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে দুই আসামির জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কমিশনার তোফায়েল আহমেদ বলেন, কারাগারের গেটে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নতুন বা পুরাতন কথা যাই বলুক না কেন আমরা সব কিছুই আমলে নিয়ে ঘটনা প্রমাণের জন্য যা প্রয়োজন তা নেব। এটি যেহেতু খুবই স্পর্শকাতর মামলা, আমরা আগাম কোনো তথ্য মিডিয়ায় প্রকাশ করে মামলার গতিকে বাধাগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত করতে চাই না। এ নিয়ে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক তা উচিত নয়। তাই আসামিদের দুই দিনের জিজ্ঞাসাবাদে তদন্ত কর্মকর্তা কী পেলেন তা আগে বলা যাবে না।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ও পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে কারাগারে বন্দি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস হত্যার যে সময়কাল বলেছে তা বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত ও ডিজিটাল মাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা যায়- সিদ্ধার্থ দাস ভোর ৪টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত বাড়ির বাইরে খালি গায়ে পায়চারী করছিল। সেই সময় পর্যন্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস সপরিবারে হত্যার শিকার শিক্ষক চক্রবর্তীর বাড়িতে যায়নি। তারা বলেছিল- রাতেই হত্যা করে ফ্রিজ খুলে শসা ও পানি খেয়েছে। হত্যার পর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করেছিল। সেখানে একটা প্লাস ছিল তা দিয়ে মিটার থেকে তার কেটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে হত্যাকারীরা।

প্রকৃত পক্ষে, সিসিটিভির ফুটেজে সেই সময় তারা বাইরে ছিল। আর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করেছে মিটার থেকে অনেক দূরে। অপরদিকে আগমনি চক্রবর্তী হত্যার রাতে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত বন্ধুর সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথপোকথন হয়েছে। তাই খুনের ঘটনা আসামিদের বর্ণনায় যা বলা হচ্ছে তা যুগান্তরের অনুসন্ধান ও তথ্য প্রমাণে মিলছে না।

খুন দিনের বেলায় ঘটেছে এসব তথ্যপ্রমাণে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে; কিন্তু কেন গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস তারা রাতে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি করছে। এটি নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। তাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তারা কী উদ্দেশ্যে বিভ্রান্ত করছে তাও খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা।

চার খুনের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে গ্রেফতার দুই যুবক জানিয়েছিল, ইয়াবা সেবনের পরে উত্তেজিত অবস্থায় গৃহকর্তা তাদের দেখে বাধা দিলে তারা একে একে ৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। তা মানতে পারছেন না মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি সনাতন চক্রবর্তী। তিনি আলাপচারিতায় এ কথা বলেছেন। তার ধারণা আরও কোনো ঘটনা বা কে জড়িত তা সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আড়াল করেছ। তাই সেদিকেও পুলিশের নজর এখন।

ফোন কলের সূত্র ধরে তাদের তালিকায় সন্দেহভাজন কয়েকজন ঘটনার পর থেকে গা-ঢাকা দিয়েছে বলে পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। তাদের গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো হত্যার ঘটনার আরও কোনো মোটিভ ছিল কিনা তা বোঝা যাবে বলে পুলিশ সূত্র বলছে।

আদালতের অনুমতি নিয়ে বুধবার দ্বিতীয় দফা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ওসি জিন্নাত আলী গ্রেফতার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। প্রায় তিন ঘণ্টা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কারাগারের গেটের ভেতর। মঙ্গলবারও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানাবেন।

যুগান্তরের মঙ্গলবারে প্রকাশিত অনুসন্ধান রিপোর্টে বলা হয়, সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস দুইজনেই পিসতুতো ও মামাতো ভাই। সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাস। সপরিবারে হত্যার শিকার গণপতি চক্রবর্তীর লাগোয়া বাড়িসহ ২ শতক জমি বিক্রি করে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে জমি বিক্রির প্রস্তুতি নেয়। এজন্য হত্যার প্রায় দেড় মাস আগে বিধান চন্দ্র দাসের সঙ্গে ২০ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে চুক্তিনামা সম্পাদন করে। শিক্ষক পরিবার খুনের ঘটনার পর এ বিষয়টি এখন আলোচনায় চলে আসছে। তাহলে কি হত্যার ঘটনাটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনামাফিক হয়েছে।

রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরাও অনুসন্ধান শুরু করেছি।

উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের দেওয়া জবানবন্দি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

রংপুরে ৪ খুন: যুগান্তরের অনুসন্ধানে মিলল নতুন তথ্য

রংপুরে ৪ খুন: যুগান্তরের অনুসন্ধানে মিলল নতুন তথ্য

সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা, প্রক্সি প্রার্থী চক্রের ৬ সদস্য গ্রেফতার

সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা, প্রক্সি প্রার্থী চক্রের ৬ সদস্য গ্রেফতার

বেরোবির রেজিস্ট্রারের নিয়োগ বাতিল করেছে সিন্ডিকেট সভা

বেরোবির রেজিস্ট্রারের নিয়োগ বাতিল করেছে সিন্ডিকেট সভা

রংপুরে ৬টি আসনে ১২ জনের মনোনয়ন বাতিল

রংপুরে ৬টি আসনে ১২ জনের মনোনয়ন বাতিল

শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেফতার

শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেফতার

রংপুরে ডেভিল হান্ট ফেস টু অভিযানে আ.লীগের গ্রেফতার ১০

রংপুরে ডেভিল হান্ট ফেস টু অভিযানে আ.লীগের গ্রেফতার ১০

আরও পড়ুন

রহস্যজনক ভূমিকায় বিআইডব্লিউটিএ পদ্মার ছয় মৌজায় অবাধে বালু ও মাটি লুট

পদ্মার ছয় মৌজায় অবাধে বালু ও মাটি লুট

৪৫ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি ২১৫ গাছতলায় চিকিৎসা শিশুদের

গাছতলায় চিকিৎসা শিশুদের

শান্তির উদ্যোগ আস্থা পায়নি

শান্তির উদ্যোগ আস্থা পায়নি

সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু প্রথম দিনে পৌঁছাল ৮৩৬ পর্যটক উৎসবের আমেজ

প্রথম দিনে পৌঁছাল ৮৩৬ পর্যটক উৎসবের আমেজ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম