ভিক্ষা ছেড়ে ১ হাজার টাকার পুঁজিতে আল আমিনের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম
বাদাম বিক্রি করছেন আল আমিন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবন যেখানে কণ্টকাকীর্ণ, সেখানেই নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন এক শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণ। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, শৈশবেই মাথার ওপর থেকে বাবার স্নেহচ্ছায়া সরে যাওয়া এবং প্রবাসে গিয়ে মায়ের নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসার নির্মম বাস্তবতাকে জয় করে জীবিকার নতুন পথ বেছে নিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের আল আমিন।
ভিক্ষার ঝুলি ফেলে দিয়ে আত্মসম্মান আর আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন এক প্যাকেট বাদামের এই ফেরিওয়ালা।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের ছোট খোচাবাড়ি গ্রামে নানার বাড়িতে কেটেছে আল আমিনের শৈশব ও কৈশোর। তার পৈতৃক বাড়ি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায়। বাবা আব্দুস সাত্তারের মৃত্যুর পর মা মফিজা বেগম এই প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে আশ্রয় নেন নিজের বাবার ভিটায়।
সংসারের চাকা ঘোরাতে বড় ভাই মামুন ও বোন রুমাকে বিয়ে দেওয়ার পর শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন মা মফিজা; কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শূন্যহাতে দেশে ফিরে আসতে হয় তাকে। এরপর থেকেই পরিবারে অভাব নিত্যসঙ্গী। অবশেষে পেটের দায়ে জন্মগত প্রতিবন্ধী আল আমিনকে নামতে হয় শহরের রাস্তায়, ধরতে হয় ভিক্ষার থলে।
তবে মানুষের করুণার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে মন সায় দেয়নি আল আমিনের। একদিন ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায়। বীরগঞ্জ উপজেলার ২৮ মাইল এলাকার আকরাম আলী ও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের দীনেশ চন্দ্র- এই দুই ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া মোট ১ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু হয় তার নতুন লড়াই। এই টাকা দিয়ে কাঁচা বাদাম কিনে ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় কথা হয় ১৮-১৯ বছরের এই তরুণের সঙ্গে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে আল আমিন শোনান তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। তিনি বলেন, আগে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততাম, ভিক্ষা করতাম। এখন নিজের পরিশ্রমে বাদাম বিক্রি করি। প্রতিদিন ১শ গ্রাম ওজনের প্রায় ১২০ প্যাকেট বাদাম বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ২শ টাকার বাদাম বিক্রি করে পুঁজি বাদে প্রতিদিন ৫শ টাকা লাভ থাকে। আমি এখন অনেক খুশি। ভিক্ষা করার চেয়ে নিজের হালাল উপার্জনে চলা অনেক সম্মানের।
শুধু বাদাম বিক্রিই নয়, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ভিন্ন এক কৌশলও বেছে নিয়েছেন তিনি। এলাকায় গান গেয়ে তিনি বাদাম বিক্রি করেন।
স্থানীয় সার ও বীজ ব্যবসায়ী এনামুল হক সরকার বলেন, আমাদের এলাকার এই আল আমিন যেন ঠিক কাঁচা বাদামের ভাইরাল গায়ক ভুবন বাদ্যকার! বেসুরো গলায় গান গেয়ে সে বাদাম বিক্রি করে; যা দেখে অনেকেই মজা পান এবং তার কাছ থেকে বাদাম কেনেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি।
বাস টার্মিনালের বাইসাইকেল বিক্রেতা আহাদ আলী বলেন, আগে ছেলেটাকে নিয়মিত ভিক্ষা করতে দেখতাম। এখন সে নিজেই পরিশ্রম করে খায়। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করছে দেখেই তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি আরও বেড়ে গেছে।
নারগুন ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য নুর ইসলামও আল আমিনের এই সাহসিকতার প্রশংসা করে সমাজের বিত্তবান ও সাধারণ মানুষকে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ভিক্ষার গ্লানি মুছে আল আমিনের এই ঘুরে দাঁড়ানো সমাজকে নতুন বার্তা দেয়—অভাব ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা শরীরকে আটকে রাখতে পারলেও মানুষের মনের জোর ও কাজের ইচ্ছাকে দমাতে পারে না। আজ হাজারও মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম—আল আমিন।
