Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

জেন-জি’র জাগরণে ভারতের চেনা রাজনীতির ধারায় বড় পরিবর্তন

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

জেন-জি’র জাগরণে ভারতের চেনা রাজনীতির ধারায় বড় পরিবর্তন

পাটনার ৩০ বছর বয়সী তরুণী ও প্রায় এক দশক ধরে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বারুণী পূর্বা। ছবি: বিবিসি

Advertisement

এক পদত্যাগ, বহু বছরের নীরবতা ভাঙার প্রতীক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে কেন্দ্রীয় কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এর আগে মাত্র একজন মন্ত্রী ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির জেরে পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। টানা এক সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না দেশের তরুণরা। তাদের কাছে এটি গণআন্দোলনের শক্তি ও জনমতের বিজয়ের এক ঐতিহাসিক প্রতীক।

বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— এই আন্দোলনের পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের গল্প।

'প্রতিবাদ করেও পরিবর্তন সম্ভব'—তরুণদের নতুন বিশ্বাস

দিল্লির ২২ বছর বয়সী আন্দোলনকারী সখীর ভাষায়, ‘জীবনে প্রথমবার মনে হয়েছে, রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।’

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠে সরকারের এক মন্ত্রীর পুরোনো বক্তব্য— ‘আমাদের সরকারে পদত্যাগ বলে কিছু হয় না।’

এখন সেই ভিডিওই তরুণদের বিজয়ের প্রতীক হয়ে ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে। সখীর মতে, ছোটবেলা থেকে তারা গণতন্ত্রে মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে পড়েছেন, কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। এবার তারা অনুভব করেছেন, সংগঠিত প্রতিবাদ রাষ্ট্রকেও সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করতে পারে।

ইনস্টাগ্রামেই গড়ে উঠল নতুন আন্দোলনের কেন্দ্র

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর ডিজিটাল সংগঠন। প্রচলিত গণমাধ্যম বা ফেসবুকের বাইরে ইনস্টাগ্রাম রিলস, মিম ও ছোট ভিডিওর মাধ্যমে মুহূর্তেই লাখো তরুণকে একত্রিত করা হয়।

পুলিশের লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার ও আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্তের ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়ে জনমতকে আন্দোলনের পক্ষে নিয়ে আসে।

সখীর মতে, সরকার তরুণদের ভাষা ও তাদের ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব বুঝতেই পারেনি।

নিট প্রশ্নফাঁস: ক্ষোভ থেকে গণআন্দোলনের সূচনা

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নফাঁস দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় ক্ষোভ আরও গভীর হয়।

এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই পরে সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেয়।

ব্যঙ্গ থেকে বাস্তব: ‘সিজেপি’র উত্থান

প্রধান বিচারপতির এক বিতর্কিত মন্তব্যের পর ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর জন্ম হয়। তাদের দাবিগুলো ছিল—

  • শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ
  • শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার
  • নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ

শুরুতে ছোট পরিসরের এই আন্দোলন পরে দেশব্যাপী ছাত্র-আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

দমন-পীড়নই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে

১৮ জুলাই আন্দোলনে নতুন মোড় আসে, যখন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ অনশনস্থল থেকে তুলে নিয়ে যায়। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রায় পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও ছররা গুলি ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দমন-পীড়নের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই হাজারো তরুণ নতুন করে আন্দোলনে যুক্ত হন।

শুধু প্রশ্নফাঁস নয়, ক্ষোভের শিকড় আরও গভীরে

আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা তরুণদের মতে, সমস্যার মূল কেবল একটি পরীক্ষা নয়। বেসরকারিকরণ, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশ্নফাঁস, চাকরির সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে ভারতের নতুন প্রজন্ম।

আইনে স্নাতক সোমায়া কোর্দে বলেন, ‘শিক্ষা যদি ভবিষ্যৎ বদলানোর একমাত্র পথ হয়, তাহলে সেই পথই যখন অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইতেই হবে।’

বেকারত্বে ভাঙছে তরুণদের স্বপ্ন

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন না অধিকাংশ তরুণ। আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে ৭ শতাংশেরও কম তরুণ স্থায়ী বেতনের চাকরি পান এবং মাত্র ৪ শতাংশ সম্মানজনক হোয়াইট-কলার চাকরির সুযোগ পান।

ফলে ক্ষোভ এখন শুধু শিক্ষা নয়, পুরো অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধেও।

পুলিশের ভয় ভেঙে রাস্তায় জেন-জি

১৮ বছর বয়সী হর্ষবর্ধন কদমের একটি ভিডিও পুরো দেশে আলোড়ন তোলে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক পুলিশ সদস্য তাকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন। ভিডিওটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

হর্ষবর্ধনের ভাষায়, ‘আমি কাউকে চাকরি হারাতে চাইনি। শুধু দেখাতে চেয়েছি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হয়।’

তার মতে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ প্রমাণ করেছে— সরকারও জনমতের চাপ অনুভব করে।

আন্দোলনের পরবর্তী লক্ষ্য কী?

বিক্ষোভস্থলগুলোতে এখন নতুন স্লোগান— ‘প্রধান কেবল শুরু, এবার মোদীর পালা।’

তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করছে, এই আন্দোলন শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে থেমে থাকবে না; বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।

বিজয়ের পাশাপাশি শঙ্কাও রয়েছে

আন্দোলনের সংগঠকদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সামনের দিনগুলোতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা আইনি হয়রানি বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে শতাধিক আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং বহুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ভারতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে।

এক নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ

তবু তরুণদের বিশ্বাস, এই আন্দোলন তাদের ভয় কাটিয়ে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তাদের ভাষায়, পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। কিন্তু একবার মানুষ যখন নিজের কণ্ঠের শক্তি বুঝে যায়, তখন তাকে আর সহজে নীরব করা যায় না।

দিল্লির এক দেয়ালে লেখা গ্রাফিতিটি যেন পুরো আন্দোলনের সারকথাই তুলে ধরে—

‘আমাদের হাতে চাকরি নেই। আজ এই লেখা মুছে দেবে, কাল আমরা আবার ফিরে আসব।’

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

কাশ্মীরের ‘লাল সোনা’ অস্তিত্ব সংকটে

কাশ্মীরের ‘লাল সোনা’ অস্তিত্ব সংকটে

স্ত্রীসহ শ্বশুরবাড়ির ৬ সদস্যকে হত্যার পর শহরে ছড়িয়ে দিলেন লাশের টুকরো!

স্ত্রীসহ শ্বশুরবাড়ির ৬ সদস্যকে হত্যার পর শহরে ছড়িয়ে দিলেন লাশের টুকরো!

স্কুটারচালককে সাহায্য করতে গিয়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত ৭

স্কুটারচালককে সাহায্য করতে গিয়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত ৭

কুমিরের কারণেই শেষ রক্ষা হলো নারীর!

কুমিরের কারণেই শেষ রক্ষা হলো নারীর!

ফের বিক্ষোভের ডাক ককরোচ পার্টির

ফের বিক্ষোভের ডাক ককরোচ পার্টির

দিল্লিতে ফের ভবন ধস, নিহত ২

দিল্লিতে ফের ভবন ধস, নিহত ২

আরও পড়ুন

আরব উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক নাবিক নিহত

আরব উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক নাবিক নিহত

মার্কিন নৌবাহিনী ১ হাজার কিলোমিটার পিছিয়ে গেছে: আইআরজিসি

মার্কিন নৌবাহিনী ১ হাজার কিলোমিটার পিছিয়ে গেছে: আইআরজিসি

ইরানের কেশম দ্বীপে মার্কিন ড্রোন ধ্বংস

ইরানের কেশম দ্বীপে মার্কিন ড্রোন ধ্বংস

প্রিন্স হ্যারির শ্বশুর গ্রেফতার

প্রিন্স হ্যারির শ্বশুর গ্রেফতার

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম