বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যে কৌশলে সাফল্য পেল ভারত
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৫ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত কয়েক সপ্তাহেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঘের হামলা, চিতাবাঘের আক্রমণ এবং হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে এমন দুর্ঘটনা এখন এত ঘন ঘন ঘটে যে সেগুলোকে অনেক সময় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
সেতু ভেঙে পড়া বা পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও একই ধরনের।
কিন্তু বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের এই সংঘাতের পেছনে ভারতের একটি সাফল্যও আছে। মানুষ বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হচ্ছে বেশি, কারণ ভারত তাদের রক্ষায় বেশ সফল হয়েছে।
বাঘের কথাই ধরা যাক।
১৯৭০-এর দশকে ভারতের জাতীয় প্রাণী হিসেবে পরিচিত এই বড় বিড়ালটির বিলুপ্তির আশঙ্কা ছিল। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত দুই দশকে ভারতে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ হয়েছে। এ সময় এশিয়ার অপেক্ষাকৃত ধনী ও কম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়ার মতো জায়গায় বাঘের সংখ্যা কমেছে।
ভারতের সাফল্য এতটাই উল্লেখযোগ্য যে, যেখানে বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই কম্বোডিয়ায়ও বাঘ পাঠাতে রাজি হয়েছে দেশটি।
ভারতের বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচি, ‘প্রজেক্ট টাইগার’, তাই বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখা যায়।
এটি অবশ্য একমাত্র উদাহরণ নয়। কয়েক বছর আগে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটে এশীয় সিংহের বাড়তে থাকা সংখ্যা সামলাতে নতুন সংরক্ষণ এলাকা তৈরি করা হয়। পূর্বাঞ্চলীয় আসামের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, আগের বছরে রাজ্যটিতে বাড়তে থাকা গন্ডারের শিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এই সাফল্য আরও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগের পথ খুলেছে। ২০২২ সাল থেকে ভারত আফ্রিকা থেকে চিতা আনছে। লক্ষ্য, ১৯৫২ সালে ভারতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীটিকে আবার দেশে প্রতিষ্ঠিত করা।
ভারতে বন্যপ্রাণী রক্ষার পেছনে জনমতেরও বড় ভূমিকা আছে। হিন্দুদের কাছে অনেক বন্য ও গৃহপালিত প্রাণী শ্রদ্ধার। বৃহত্তর ভারতীয় সমাজেও প্রাণী হত্যা বা নির্যাতন ভালো চোখে দেখা হয় না। এশিয়ার সবচেয়ে কঠোর প্রাণী সুরক্ষা আইনগুলোর কিছু ভারতেই রয়েছে।
সংরক্ষণে প্রাণীদের চেহারাও কিছুটা কাজে আসে। বাঘ, সিংহ বা হাতির মতো আকর্ষণীয় প্রাণীর পক্ষে জনসমর্থন পাওয়া সহজ। কিন্তু ভারতের প্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগ কেবল সুন্দর প্রাণীদের ঘিরে নয়। টাকমাথা, কুঁজো এবং মৃতদেহভোজী শকুনের সংখ্যাও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও বহুদিন ধরে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আগ্রহ দেখিয়েছে।
দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে সম্রাট অশোক শিকার নিষিদ্ধ করার পক্ষে নির্দেশ জারি করেছিলেন। আধুনিক ভারতের নেতারাও সেই ধারার অনুসরণ করেছেন। ১৯৭০-এর দশকের বেশির ভাগ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা ইন্দিরা গান্ধী প্রজেক্ট টাইগার শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগ্রহের মধ্যে বন্যপ্রাণীর ছবি তোলাও রয়েছে।
আরেকটি কারণ হলো নীতির ধরন। ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র এমন কিছু কাজে তুলনামূলকভাবে ভালো করে, যেগুলোকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঘিরে পরিচালিত বিশেষ কর্মসূচিতে ভাগ করা যায়। নীতিনির্ধারণের ভাষায় একে বলা হয় ‘মিশন মোড’—সীমিত ও স্পষ্ট লক্ষ্য, আলাদা দল এবং নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা।
ভারতের জনস্বাস্থ্যের কিছু বড় সাফল্যও এভাবে এসেছে। পোলিও নির্মূল এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত টিকা দেওয়ার কর্মসূচিতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও একই মডেল কাজ করেছে। প্রজেক্ট টাইগারের পর এসেছে প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট, প্রজেক্ট স্নো লেপার্ড, প্রজেক্ট ডলফিন ও প্রজেক্ট রাইনো।
এই কাজকে সহায়তা করছে দুটি ধরনের প্রতিষ্ঠান। একটি হলো বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণের সরকারি কাঠামো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কাঠ সংগ্রহের জন্য ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিস তৈরি করেছিল। স্বাধীনতার পর সেই কাঠামোর একটি বড় অংশ বন ও বনভূমির প্রাণী রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়।
অন্যটি হলো নাগরিক সমাজ—বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক এনজিও, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। তারা বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দেন, আবার রাষ্ট্রের কাজের ওপর নজরও রাখেন।
অবশ্য ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিখুঁত নয়। বরং বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে নতুন সমস্যাও তৈরি হয়েছে। মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সংঘাত তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি।
তারপরও তুলনামূলকভাবে দরিদ্র একটি দেশ, যেখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা সীমিত এবং সম্পদের ওপর অসংখ্য দাবি রয়েছে, সেখানে অন্য প্রাণী রক্ষায় মানুষ ও রাজনীতিকদের একসঙ্গে কাজ করা একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তাই ভারতের রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি দেখায়, আজ যে সমস্যাগুলোকে অমীমাংসিত মনে হয়, সেগুলোর কিছু সমাধান করাও সম্ভব।
যে দেশ একশৃঙ্গ গন্ডার রক্ষায় অর্থ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা খুঁজে পেতে পারে, সে দেশ বলতে পারে না যে অর্থের অভাব বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে দূষিত বায়ু, দমবন্ধ করা নদী কিংবা আবর্জনায় ভরা জমির সমস্যা মোকাবিলা করা অসম্ভব।
আর যদি মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার যুক্তি ভারতের নেতাদের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে পরিবেশবাদীরা হয়তো আরেকটি যুক্তি দিতে পারেন: বাঘ ও হাতিরও পরিষ্কার বাতাস ও পানি দরকার।

