চাঁপাইনবাবগঞ্জের শীর্ষ মাদক কারবারি
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত জুয়েল ঘুরছেন দেশ-বিদেশে
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাদকসম্রাট জুয়েল রানা (৩৪)। বাবার নাম আমির আলি। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া গ্রামে। চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য। জেলার তালিকাভুক্ত শীর্ষ পাঁচ মাদক কারবারির একজন। সীমান্তপথে ভারত থেকে হেরোইনের চালান এনে দেশের অভ্যন্তরণে পাচার করা ছাড়াও অঞ্চলজুড়ে ইয়াবা পাচারের অন্যতম হোতা জুয়েল। মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাতটি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে গত বছর ১২ অক্টোবর হেরোইন ও ইয়াবা পাচারের একটি মামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত জুয়েল ও তার সহযোগী ববিতা খাতুনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার সময় জুয়েল পলাতক ছিলেন। আদালত থেকে তাকে ধরতে তাৎক্ষণিক হুলিয়া ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। কিন্তু আজও তাকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
জুয়েল রানা ৪ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশকে আর কষ্ট করে আমাকে খুঁজতে হবে না। আগামীকাল আমার মিশন শেষ করে পুলিশের কাছে সারেন্ডার দিব ইনশাল্লাহ।’ সম্প্রতি জুয়েল কাতার হয়ে সৌদি আরবে যান। মক্কায় গিয়ে ওমরাহ পালন করে ফেসবুকে ছবি আপলোড করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, জুয়েল গত নির্বাচনের পুরোটা সময়েও একজন প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন নিজ এলাকায়। দুহাতে খোলামকুচির মতো টাকা বিলিয়েছেন। পুলিশের সামনে দিয়ে ঘুরেছেন। অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা পুলিশ বারবারই বলেছে, তারা জুয়েলকে খুঁজে পাচ্ছে না।
জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর ডিএনসির একটি দল শহরের বালুবাগানের একটি বাড়ি থেকে জুয়েলের অন্যতম সহযোগী ববিতা খাতুনকে ৭৫০ গ্রাম হেরোইনসহ আটক করে। ববিতা তাদের জানায়, এই মাদক জুয়েল রানার। তার প্রাথমিক স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ডিএনসির দলটি জুয়েল রানার বেলেপুকুরের বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখানে ২০০ গ্রাম হেরোইনের আরও একটি চালানসহ জুয়েলকে গ্রেফতার করা হয়। ডিএনসির উপপরিদর্শক আসাদুর রহমান বাদী হয়ে সদর থানায় মামলা করেন। এ মামলাতেই জুয়েলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হন।
জানা যায়, জুয়েল রানা ডিএনসির তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি হলেও সব সময় থেকেছেন ক্ষমতার ছাতার তলে। অতীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদের অর্থ জোগানদাতাদের অন্যতম ছিলেন এই জুয়েল।
আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, হেরোইনসহ গ্রেফতারের মাত্র ২৮ দিনের মাথায় ১৩ নভেম্বর জেলার একটি আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন জুয়েল। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েই জুয়েল সদলবলে ছুটে যান আব্দুল ওদুদের পুরোনো জেলখানার বাসায়। ওদুদ ফুলের মালা দিয়ে জুয়েলকে বরণ করেন। এরপর জুয়েল বিশাল মোটরসাইকেল শোডাউন দিতে দিতে ও বোমা ফাটাতে ফাটাতে নিজ এলাকা চরবাগাডাঙ্গায় ফেরেন। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর যুগান্তরে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, জুয়েল রানা জেলার শীর্ষ পাঁচ মাদক কারবারির একজন। আমরা তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করেছি। তবে সে অত্যন্ত ধুরন্ধর। তার বাড়ি সীমান্ত এলাকায়। জেলা শহরেও তার একাধিক বাড়ি আছে। ঢাকাতেও বাড়ি থাকার কথা। ফলে কখন কোথায় অবস্থান করেন, তা শনাক্ত করা কঠিন। পুলিশ বা বিজিবি চাইলে সহজেই তাকে গ্রেফতার করতে পারে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জুয়েল রানার ৩১টি ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। এ বিষয়ে জুয়েলের নামে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি চলমান রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ যুগান্তরকে বলেন, জুয়েল রানাকে ধরতে পুলিশ ইতোমধ্যে একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে সে বিদেশে চলে গেছে-এমন তথ্য জেলা পুলিশের কাছে নেই।
