বদলির আগে সন্ত্রাসীর ৬৫ দলিল একদিনে রেজিস্ট্রি
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) এক কর্মকর্তা হত্যা মামলার আসামি ও ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল একদিনে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন সীতাকুণ্ডের সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। বদলির আদেশ হওয়ার একদিন পর বুধবার এসব দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন তিনি। রেজিস্ট্রিকৃত জমির মূল্য শতকোটি টাকা বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের খাতায় ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসীর নামে থাকা বিপুল পরিমাণ এই জমির দলিল রেজিস্ট্রির ঘটনায় তোলপাড় চলছে। ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব দুই কোটি টাকা ঘুস নিয়ে এসব দলিলের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন বলে অফিসের একটি সূত্র দাবি করেছে। এমন অভিযোগ ওঠার পর তার বদলির আদেশ স্থগিত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এদিকে রেজিস্ট্রি করা দলিলের কাগজপত্র আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলগুলো এখন পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এত বিপুল পরিমাণ দলিল কেন একদিনে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলো, হাতবদল হওয়া দলিলে জমির পরিমাণ কত, এসব জায়গা কার কার নামে হস্তান্তর করা হয়েছে, এসব জায়গায় সরকারের কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কিনা, জমির বর্তমান বাজার মূল্য কত-তা খতিয়ে দেখা হবে। তাছাড়া নিয়ম অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে দাতার উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। পুলিশের খাতায় পলাতক আসামি ইয়াসিন দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় সাবরেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত ছিলেন কিনা সে বিষয়টিও তদন্ত করা হবে।
সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন জঙ্গল সলিমপুরে বিপুল পরিমাণে সরকারি খাস জায়গা নানা কৌশলে নিজের নামে বিএস (বাংলাদেশ সার্ভে) রেকর্ড করে নিয়েছিলেন। তিন মাস ধরে এসব জায়গা নানা জনের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন। গত সোমবার সীতাকুণ্ডের সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরে বদলি করা হয়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের কথা ছিল তার। সূত্র জানায়, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগের দিন মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সন্ত্রাসী ইয়াসিনের বিপুল পরিমাণ জায়গার বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন রায়হান হাবীব। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বুধবার বিকালে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাবীবের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করেছে মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার সকালে সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলেও রায়হান হাবীবের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার সহকারী সিরাজউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘রেজিস্ট্রি দলিল হওয়া জমিগুলো ব্যক্তি মালিকানার। ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী, এসব জমি ইয়াসিনের নামে নামজারি করা ছিল। ইয়াসিনের খাজনাও আপডেট রয়েছে। কাগজপত্র ও দলিলসহ এসব জমি বিক্রির জন্য দলিল জমা দেন। কাগজপত্র ঠিক থাকায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে। এসব জমি নিয়ে সরকারের বিশেষ কোনো নির্দেশনাও ছিল না।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। পাশাপাশি ইউএনও কার্যালয়ও দেখভাল করছে। বেশকিছু কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।’
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসাবে পরিচিত জঙ্গলসলিমপুর। কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনী ও রুকন মেম্বারের ত্রাসের কারণে সাধারণ মানুষ তটস্থ। এই দুই বাহিনী পুরো এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণ মানুষ তাদের কাছে অনেকটা জিম্মি। তাদের হয়ে আরও একাধিক উপ-বাহিনীর বিচরণ রয়েছে এই এলাকায়।
গত ১৯ জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চালাতে কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করে তৎকালীন র্যাবের একটি দল। পরে মাইকিং করে ইয়াসিন বাহিনী ও স্থানীয়দের একটি অংশ র্যাব কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তারা। এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হয়।
সর্বশেষ গত ২৪ মে দুই থেকে ৩শ সন্ত্রাসী গভীর রাতে রাস্তা কাটে এবং নির্মাণাধীন র্যাব ও যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় র্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের রাতভর গুলিবিনিময় হয়। প্রশাসন ১০৪ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে ৩ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ। তবে এখনো পর্যন্ত ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিন অধরা।
