রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম
রাতে কি পা অস্থির লাগে
Advertisement
ডা. তাহমীদ কামাল
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাতে ঘুমাতে গেলেই পায়ে অদ্ভুত অস্বস্তি। মনে হয় পা নড়াতেই হবে। কেউ বলেন ঝিনঝিন করছে, কেউ বলেন পায়ের ভেতরে যেন কিছু হাঁটছে, আবার কারও টান, জ্বালাপোড়া বা অস্থির অনুভূতি হয়। পা নড়াচড়া করলে বা উঠে কিছুক্ষণ হাঁটলে সাময়িক আরাম মেলে, কিন্তু বিশ্রামে গেলেই আবার শুরু হয়। এমন সমস্যা নিয়মিত হলে এটি রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম (আরএলএস) হতে পারে।
* রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম বা আরএলএস কী
আরএলএস স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সমস্যা, যেখানে পায়ে অস্বস্তিকর অনুভূতির সঙ্গে পা নড়ানোর প্রবল তাগিদ তৈরি হয়। সাধারণত বসে বা শুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় সমস্যা বাড়ে এবং হাঁটা বা পা নড়ালে সাময়িকভাবে কমে। সন্ধ্যা ও রাতে উপসর্গ বেশি হওয়ায় ঘুমের ব্যাঘাত আরএলএস-এর অন্যতম প্রধান সমস্যা।
দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে দিনের বেলায় ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
* কীভাবে বুঝবেন
আরএলএস-এর চারটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ-
১. পা নড়ানোর প্রবল ইচ্ছা : সাধারণত এর সঙ্গে ঝিনঝিন, টান, অস্বস্তি, জ্বালাপোড়া বা পায়ের ভেতরে অদ্ভুত অনুভূতি থাকে।
২. বিশ্রামে সমস্যা বাড়ে : দীর্ঘ সময় বসে থাকা, গাড়ি বা বিমানে ভ্রমণ কিংবা বিছানায় শুয়ে থাকার সময় উপসর্গ শুরু বা বেড়ে যেতে পারে।
৩. নড়াচড়ায় সাময়িক আরাম হয় : হাঁটা, পা নাড়ানো বা স্ট্রেচিং করলে অনেকের অস্বস্তি কমে।
৪. সন্ধ্যা বা রাতে বেশি হয় : দিনের তুলনায় রাতে উপসর্গ সাধারণত বেশি থাকে।
তবে পায়ে ব্যথা বা ঝিনঝিন হলেই আরএলএস বলা যায় না। পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি, পেশির ক্র্যাম্প, রক্তনালির সমস্যা, আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন রোগে কাছাকাছি ধরনের উপসর্গ হতে পারে।
* কেন হয়
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে আরএলএস-এর নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। পারিবারিক বা জেনেটিক প্রবণতাও থাকতে পারে। মস্তিষ্কের ডোপামিন ব্যবস্থার সঙ্গে এ রোগের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে শরীরে আয়রনের ঘাটতি আরএলএস-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চিকিৎসাযোগ্য কারণ। এছাড়া গর্ভাবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ এবং কিছু স্নায়বিক সমস্যার সঙ্গে আরএলএস দেখা যেতে পারে।
কিছু ওষুধও উপসর্গ বাড়াতে পারে। তাই নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর সমস্যা বেড়ে গেলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
* চিকিৎসার আগে প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন
আরএলএস-এর চিকিৎসায় শুধু ঘুমের ওষুধ বা ব্যথার ওষুধ খাওয়াই সমাধান নয়। প্রথমে সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের ফেরিটিন ও আয়রন স্টাডিজ, সিবিসি, কিডনি ফাংশনসহ অন্য পরীক্ষা করতে পারেন। আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন দেওয়া হতে পারে। নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়, কারণ অতিরিক্ত আয়রনও ক্ষতিকর হতে পারে।
* রিহ্যাবিলিটেশন ও ব্যায়ামের ভূমিকা
আরএলএস নিয়ন্ত্রণে রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে হালকা থেকে মাঝারি উপসর্গে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও জীবনযাপনের পরিবর্তন অনেকের উপকারে আসে।
* নিয়মিত মাঝারি ব্যায়াম
প্রতিদিন বা সপ্তাহের অধিকাংশ দিনে সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা, স্টেশনারি সাইক্লিং বা হালকা অ্যারোবিক ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব ভারী ব্যায়াম করলে কারও কারও উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে।
* স্ট্রেচিং
বিশেষ করে কাফ বা পায়ের পেছনের পেশি, হ্যামস্ট্রিং এবং উরুর পেশির মৃদু স্ট্রেচিং উপকারী হতে পারে। রাতে উপসর্গ শুরু হলে বিছানা থেকে উঠে কয়েক মিনিট হাঁটা ও হালকা স্ট্রেচিং অনেকের সাময়িক আরাম দেয়।
* ম্যাসাজ ও তাপমাত্রার ব্যবহার
পায়ের মৃদু ম্যাসাজ, উষ্ণ গোসল অথবা গরম কিংবা ঠান্ডা প্যাক কিছু রোগীর অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে। কোনটি বেশি কার্যকর তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
* দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থায় নয়
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে মাঝে মাঝে উঠে কয়েক মিনিট হাঁটুন। দীর্ঘ ভ্রমণের সময় সুযোগ থাকলে বিরতি নিয়ে পা নড়াচড়া ও স্ট্রেচিং করুন। বয়স্ক ব্যক্তি বা যাদের ভারসাম্য, হাঁটাচলা, পেশিশক্তি বা অন্য শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্ট বা রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যক্তিভিত্তিক ব্যায়াম পরিকল্পনা করা নিরাপদ ও কার্যকর।
* ঘুমের অভ্যাসেও পরিবর্তন প্রয়োজন
আরএলএস এবং ঘুমের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিদিন সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস করা ভালো। ঘুমের পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখুন এবং রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস কমান।
বিকাল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত কফি, চা, এনার্জি ড্রিংকসহ ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চললে কিছু মানুষের উপসর্গ কমে। অ্যালকোহল ও ধূমপানও কারও কারও আরএলএস বাড়াতে পারে।
* কখন ওষুধ প্রয়োজন
জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত কারণের চিকিৎসার পরও যদি উপসর্গ ঘন ঘন হয়, ঘুম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে বা দৈনন্দিন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন চিকিৎসক ওষুধ বিবেচনা করতে পারেন।
বর্তমানে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী Gabapentin বা pregabalin-এর মতো ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অন্য ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে। আগে আরএলএস-এ dopamine agonist জাতীয় ওষুধ বহুল ব্যবহৃত হলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ আরও আগে শুরু হওয়া, তীব্র হওয়া বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার মতো ‘augmentation’ সমস্যা হতে পারে। তাই ওষুধ নির্বাচন অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।
* কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
পায়ের অস্থিরতার কারণে যদি নিয়মিত ঘুম নষ্ট হয়, দিনের কাজে প্রভাব পড়ে, উপসর্গ ক্রমশ বাড়ে অথবা সপ্তাহে একাধিকবার সমস্যা হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আর পা হঠাৎ ফুলে যাওয়া, লাল বা গরম হয়ে যাওয়া, তীব্র ব্যথা, নতুন দুর্বলতা বা অবশভাব দেখা দিলে সেটিকে শুধু আরএলএস ভেবে বসে থাকা উচিত নয়-দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম আপাতদৃষ্টিতে ছোট সমস্যা মনে হলেও দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ঘুম, কর্মক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সুখবর হলো, সঠিক রোগনির্ণয়, আয়রনের ঘাটতির মতো চিকিৎসাযোগ্য কারণ শনাক্ত করা, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং, ভালো ঘুমের অভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তাই রাতে পা অস্থির হলেই শুধু সহ্য করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণটি খুঁজে বের করে চিকিৎসা ও রিহ্যাবিলিটেশন-দুইয়ের সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই হতে পারে স্বস্তির পথে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
লেখক : ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ।
