Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

কুরবানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ

মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

কুরবানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য

কুরবানি মুসলিম উম্মাহর আদর্শ। ছবি: সংগৃহীত

কুরবানির ইতিহাস অতি প্রাচীন। কুরআনে হাবিল-কাবিলের ঘটনাই তার প্রমাণ। ইসলামে প্রথম কুরবানি এটি। হাবিল প্রথম মানুষ, যিনি আল্লাহর জন্য একটি পশু কুরবানি করেন। ধর্মীয় বিবরণ থেকে জানা যায়, হাবিল একটি ভেড়া এবং তার ভাই কাবিল তার ফসলের কিছু অংশ স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন।

সে সময় আল্লাহর নির্ধারিত শরিয়ত বা পদ্ধতি ছিল এই যে, আকাশ থেকে আগুন নেমে আসবে এবং যার কুরবানি কবুল হবে তার জিনিসকে আগুন গ্রহণ করবে। অর্থাৎ অগুন সে জিনিসকে জালিয়ে ভষ্ম করে দেবে। সেই অনুযায়ী, আকাশ থেকে নেমে আসা নেককার হাবিলের জবেহকৃত পশুটির কুরবানি গ্রহণ করে। অন্যদিকে কাবিলের ফসলস্বরূপ প্রদত্ত কুরবানি প্রত্যাখ্যাত হয়। কুরআনুল কারিমে এ ঘটনা এভাবে ওঠে এসেছে—

وَ اتۡلُ عَلَیۡهِمۡ نَبَاَ ابۡنَیۡ اٰدَمَ بِالۡحَقِّ ۘ اِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنۡ اَحَدِهِمَا وَ لَمۡ یُتَقَبَّلۡ مِنَ الۡاٰخَرِ ؕ قَالَ لَاَقۡتُلَنَّکَ ؕ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰهُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ

‘আর তুমি তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা কর, যখন তারা উভয়ে কুরবানি পেশ করল। এরপর তাদের একজন থেকে গ্রহণ করা হলো, আর অপরজন থেকে গ্রহণ করা হলো না। সে বললো, ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করবো। অন্যজন বললো, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের থেকে গ্রহণ করেন।’ (সুরা মায়েদা: আয়াত ২৭)

পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা ইসলামের নবি ও রাসুল, মুসলিম জাতির পিতা, হজরত ইবরাহিমকে (আ.) স্বপ্নযোগে এ মর্মে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানি করার নির্দেশ দেন, ‘তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কুরবানি কর। হজরত ইবরাহিম (আ.) আদিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর জন্য ১০টি উট কুরবানি করেন। কিন্তু পুনরায় তিনি কুরবানি করার জন্য আদেশ প্রাপ্ত হন। তখন তিনি আবারও ১০০টি উট কুরবানি করেন।

তারপরেও তিনি একই আদেশ পেয়ে ভাবলেন, আমার কাছে তো এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রিয়বস্তু হলো— পুত্র ইসমাইল (আ.)। এছাড়া আর কোনো প্রিয় বস্তু নেই। তখন তিনি হজরত ইসমাইলকে (আ.) কুরবানি করতে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। যখন হজরত ইবরাহিম তার পুত্রকে কুরবানি দেওয়ার জন্য গলায় ছুরি চালানোর চেষ্টা করেন, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে দেখেন যে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি প্রাণী কুরবানি হয়েছে এবং তার কোনো ক্ষতি হয়নি। এ ঘটনা কুরআনুল কারিমে এভাবে ওঠে এসেছে—

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعۡیَ قَالَ یٰبُنَیَّ اِنِّیۡۤ اَرٰی فِی الۡمَنَامِ اَنِّیۡۤ اَذۡبَحُکَ فَانۡظُرۡ مَاذَا تَرٰی ؕ قَالَ یٰۤاَبَتِ افۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُ ۫ سَتَجِدُنِیۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِیۡنَ  فَلَمَّاۤ اَسۡلَمَا وَ تَلَّهٗ لِلۡجَبِیۡنِ

‘এরপর যখন সে তার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছলো, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত; সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। এরপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে কাত করে শুইয়ে দিল।’ (সুরা আস-সাফফাত: ১০২-১০৩)

فَلَمَّاۤ اَسۡلَمَا وَ تَلَّهٗ لِلۡجَبِیۡنِ

‘অতঃপর বাবা-ছেলে উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম (আ.) তাকে জবেহ করার জন্য তাকে কাত করে শুইয়ে দিলেন।’ (সুরা সাফফাত: আয়াত ১০৩)

قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡیَا ۚ اِنَّا کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ - وَ نَادَیۡنٰهُ اَنۡ یّٰۤاِبۡرٰهِیۡمُ

‘তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহিম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয়ই আমি এইভাবে সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সুরা সাফফাত: আয়াত ১০৪-১০৫)

اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الۡبَلٰٓـؤُا الۡمُبِیۡنُ - وَ فَدَیۡنٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِیۡمٍ

‘নিশ্চয়ই এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার (সন্তান কুরবানির) পরিবর্তে জবেহযোগ্য এক মহান জন্তু দিয়ে (কুরবানি করিয়ে) তাকে (সন্তানকে) মুক্ত করে নিলাম।’ (সুরা সাফফাত: আয়াত ১০৬-১০৭)

وَ تَرَکۡنَا عَلَیۡهِ فِی الۡاٰخِرِیۡنَ

আর এ (কুরবানির) বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম। (সুরা সাফফাত: আয়াত ১০৮)

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা কতই না মহান! যিনি তার বন্ধু হজরত ইবরাহিমকে (আ.) প্রিয় সন্তান কুরবানির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনিও তার নির্দেশ পালন নিজ সন্তানকে জবেহ করার জন্য শুইয়ে দিয়েছেন। আর তিনি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তারপর থেকেই মুসলিম উম্মাহ কুরবানির এ বিধান পালন করে আসছেন।

ঐতিহাসিক এই ধর্মীয় ঘটনাকে স্মরণ করে সারাবিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতি বছর ঈদুল আজহা উৎসব পালন করে। ইসলামে হিজরি ক্যালেন্ডারের ১২তম চন্দ্রমাস জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করার সময় হিসাবে নির্ধারিত। এ দিনে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি দেন।

তাই মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা উত্তম যে, সামর্থ্য থাকলে কুরবানি আদায় করাই উত্তম। কোনোভাবেই কুরবানি থেকে বিরত না থাকা। সক্ষম হলে নিজের ও পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করা। এর মাধ্যমে যেমন আল্লাহর নির্দেশ মানা হয় তেমনি সাহাবাদের অনুসরণ ও অনুকরণ হয়। ফলে এতে রয়েছে বিশাল সওয়াবের হাতছানি।

কুরআন-সুন্নার এসব দিকনির্দেশনা থেকে প্রমাণিত যে-

কুরবানি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। মুসলিম উম্মাহর জন্য ঐতিহ্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অর্থ খরচ করে স্বার্থ ত্যাগ করে এ ইবাদত করতে হয়। কুরবানির পর পরিবার ও দরিদ্রজনের উপর কুরবানির পশুর গোশত খরচ করা হয় এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য হাদিয়া ও উপঢৌকন পেশ করার সুযোগ হয়। কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য করতে পেরেই মুমিন মুসলমান আনন্দ পেয়ে থাকে। মুমিনের সেই খুশিই হলো কুরবানির খুশি।

কুরবানি না করে কুরবানির টাকা গরিব-দুঃখীর মাঝে বণ্টন করে দিলে কুরবানির হক আদায় হবে না। কারণ কুরবানিতে আল্লাহর জন্য পশু জবাই করা হলো ইবাদত ও দ্বীন ইসলামের নির্দশন এবং প্রতীক। এ কারণেই ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন—

‘কুরবানি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সমগ্র মুসলিম জাতির এক আমল। আর কোথাও কথিত নেই যে, তাঁদের কেউ কুরবানির পরিবর্তে তার মূল্য সাদকাহ করেছেন। আবার যদি তা উত্তম হতো তবে তাঁরা নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম করতেন না।’ (ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া)

আরও পড়ুন
কুরবানির ফজিলত ও তাৎপর্য

মনে রাখতে হবে

কুরবানি দ্বারা জবাই উদ্দেশ্য। সুতরাং পশু জবাই করা কুরবানির মূল্য সাদকাহ করা অপেক্ষা উত্তম। যদিও সে তা কুরবানির চেয়ে পরিমাণে বেশি হয়। কারণ, কুরবানিতে জবাই হলো উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কুরবানি সম্পর্কে বলেছেন-

১. فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ পড় এবং কুরবানি কর।’ (সুরা কাউসার: আয়াত ২)

২. قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ للهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ

‘(হে রাসুল! আপনি) বলুন, অবশ্যই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই।’ (সুরা আনআম: আয়াত ১৬২)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-

৩. وَ یَذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰهِ فِیۡۤ اَیَّامٍ مَّعۡلُوۡمٰتٍ عَلٰی مَا رَزَقَهُمۡ مِّنۡۢ بَهِیۡمَۃِ الۡاَنۡعَامِ

‘তারা কতক নির্দিষ্ট দিনে গৃহ পালিত চতুষ্পদ জন্তুর মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে।’ (সুরা হজ: আয়াত ২৮)

৪. لَنۡ یَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوۡمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُهُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ

‘আল্লাহর কাছে (কুরবানির পশুর)) গোশত ও রক্ত পৌঁছে না বরং তোমাদের অন্তরের তাকওয়া পৌঁছে থাকে। (সুরা হজ: আয়াত ৩৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে বলেন— হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কুরবানির দিন পশু কুরবানির চাইতে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই। কেয়ামতের দিন জবাই করা পশুকে তার শিং ও খুরসহ হাজির করা হবে। কুরবানির জন্তুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা খোলা মনে এবং সন্তুষ্টি চিত্তে কুরবানি কর।’ (মেশকাত)

সুতরাং কুরআন-সুন্নার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ দিয়ে নামাজ ও কুরবানির ইবাদত আদায় করলে হবে না। এর অন্যতম প্রমাণ হলো— হজের ক্ষেত্রে যারা তামাত্তু ও কিরান হজ করবেন, তারা যদি কুরবানির পরিবর্তে তিনগুণ বা তারচেয়েও বেশি সাদকাহ করে তাতে তার বিনিময় হবে না। ঠিক কুরবানিও তাই। আর আল্লাহ তাআলাই বেশি জানেন।

কুরবানি নামাজের মতো স্বাতন্ত্র ইবাদত। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কুরবানির গুরুত্ব, ফজিলত ও সাওয়াব অনেক বেশি। আর এটা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাত হওয়ার কারণেই নবীজি (সা.) নিজে তা পালন করেছেন। সে কারণে তা উম্মতে মুহাম্মাদির সামর্থ্যবানদের জন্যও আদায় করা আবশ্যক।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .