কুরবানি: ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৪ পিএম
কুরবানি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘উদহিয়াহ’ বা কুরবানি— আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহান ইবাদত। কুরবানি বলতে বোঝায়— কুরবানির নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় উট, গরু, ছাগল বা ভেড়া জবাই করা। কুরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাজ নয়; বরং এটি এমন এক ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা তার ভালোবাসা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রমাণ দেয়। সাধারণভাবে, যে কোনো কাজ যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম—তাই কুরবান। আর কুরবানি জবাই করার উত্তম সময় হলো জিলহজ মাসের ১০ তারিখ।
কুরআনের নির্দেশ
নামাজ ও কুরবানি আনুগত্যের প্রতীক। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি করো।’ (সুরা কাউসার: আয়াত ২)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ তার নবীকে নামাজ ও কুরবানির নির্দেশ দিয়েছেন। এ দুটি ইবাদতই আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন— তিনি ছিলেন অধিক নামাজ আদায়কারী এবং নিয়মিত কুরবানি দাতা।
নবীজির আমল: কুরবানিতে ধারাবাহিকতা
হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন— ‘নবী (সা.) মদিনায় অবস্থানকালে দশ বছর কুরবানি করেছেন।’ (মুসনাদ আহমাদ; তিরমিজি)
হজরত আনাস (রা.) বলেন—
ضَحَّى النَّبِيُّ ﷺ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদা-কালো মিশ্র রঙের, শিংবিশিষ্ট দুটি দুম্বা কুরবানি করেছেন।’ (বুখারি ৫৫৫৮; মুসলিম ১৯৬৬)
নবী (সা.) কোনো বছর কুরবানি ত্যাগ করতেন না। (যাদুল মা‘আদ ২/৩১৭)
কুরবানির সময় ও গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু নিজের কর্ম দিয়েই নয়, বরং বাণীর মাধ্যমেও কুরবানির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
হাদিসে পাকে এসেছে— ‘যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে জবাই করে, সে নিজের জন্য জবাই করে। আর যে নামাজের পরে জবাই করে, তার কুরবানি সম্পন্ন হয় এবং সে মুসলমানদের সুন্নাহ অনুসরণ করে।’ (বুখারি: ৫৫৪৫/৫২২৬)
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন— ‘যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (মুসনাদ আহমাদ ২/৩২১; ইবনে মাজাহ ৩১২৩; মুসতাদরাকে হাকিম ২/৩৮৯)
কুরবানি: ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ?
কুরবানি যে শরিয়তসম্মত ইবাদত— এ ব্যাপারে সকল মুসলিম একমত। তবে এটি ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ—এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-সহ কিছু আলেম এটিকে ওয়াজিব বলেছেন। অধিকাংশ সাহাবি, তাবেঈন ও ফকিহদের মতে এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (তাকিদপ্রাপ্ত সুন্নাহ)। তবে উত্তম পথ হলো—সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি ত্যাগ না করা।
সহযোগিতায় কুরবানি: কী হবে বিধান?
অন্যের দান বা সহযোগিতায় কেউ হজ বা কুরবানি করলে তা আদায় হয়ে যাবে এবং দাতা ও কর্তা উভয়েই সওয়াবের অধিকারী হবে। তবে ঋণ করে কুরবানি দেওয়া জরুরি নয়।
এছাড়া কেউ যদি অন্যের (যেমন—অসিয়তকারীর) পক্ষ থেকে কুরবানি করে, তবে তার নিজের পক্ষের কুরবানি আদায় হবে না।
নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি
প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজের ও তার পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা। এতে আল্লাহর আদেশ পালন এবং নবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে বিরাট সওয়াব অর্জিত হয়।
কুরবানি বাদ দিয়ে শুধু সদকা যথেষ্ট নয়
যেমন হজ না করে তার অর্থ সদকা করলে ফরজ আদায় হয় না, তেমনি কুরবানি না করে তার মূল্য সদকা করলেও কুরবানি আদায় হয় না। কারণ, কুরবানি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত— যেখানে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ করা হয়। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ২৬/৩০৪)
কুরবানি বনাম সদকা: কোনটি উত্তম?
হজরত ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেন— ‘কুরবানি করা তার মূল্য সদকা করার চেয়ে উত্তম, যদিও সেই মূল্য বেশি হয়।’ কারণ এটি নামাজের মতো নির্ধারিত ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম: আয়াত ১৬২)
জীবিত ও মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানি
কুরবানি মূলত জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকেই করা উত্তম। তবে সে চাইলে তার সওয়াবে জীবিত বা মৃত আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। নবীজি (সা.) নিজের, পরিবার-পরিজন এবং উম্মতের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন।’ (মুসনাদ আহমাদ ৬/৩৯১-৩৯২; বায়হাকি ৯/২৬৮)
একটি কুরবানিতে একাধিক মৃত ব্যক্তিকেও শরিক করা বৈধ, যদি তাদের ওপর আলাদা কুরবানি ওয়াজিব না থাকে। শুধুমাত্র মৃত ব্যক্তির জন্য আলাদা করে কুরবানি নির্ধারণ করা উত্তম নয়। বরং নিজের নামের সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা উত্তম। নবী (সা.) কুরবানি করার সময় দোয়া করতেন— ‘হে আল্লাহ! এটি মুহাম্মদের পক্ষ থেকে এবং মুহাম্মদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে।’
মৃত ব্যক্তির অসিয়ত অনুযায়ী কুরবানি
যদি কোনো ব্যক্তি তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে কুরবানি করার অসিয়ত করে যান, তবে তা বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব। এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা বৈধ নয়। প্রয়োজনে কয়েক বছরের অর্থ একত্র করে কুরবানি দিতে হবে। যাদের ওপর এই দায়িত্ব অর্পিত হবে, তাদের উচিত সতর্কতার সঙ্গে অসিয়ত বাস্তবায়ন করা, যাতে মৃত ব্যক্তির উপকার হয়।
মুসাফিরের কুরবানি
মুসাফিরের জন্যও করবানি করা বৈধ ও প্রমাণিত। হাদিসে পাকে এসেছে— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় অবস্থানকালে তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন।’ (বুখারি ২৯৪, ৫৫৪৮; মুসলিম ১৯৭৫; বায়হাকি ৯/২৯৫)
কুরবানির শিক্ষা—ত্যাগে সাফল্য
কুরবানি কেবল পশু জবাই নয়; এটি ত্যাগ, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ আমাদের শেখায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু উৎসর্গ করাই প্রকৃত সফলতা।
তাই সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের উচিত—নিয়ম মেনে, আন্তরিকতার সঙ্গে কুরবানি আদায় করা এবং এর মাধ্যমে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে নিবেদিত করার অঙ্গীকার করা।

